কবি শামসুর রাহমান

গুণীজন

‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাবার জন্য হে স্বাধীনতা’ ইত্যাদি কালজয়ী বহু কবিতার রচয়িতা, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি শামসুর রাহমান। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরানো ঢাকার মাহুতটুলির ৪৬ নম্বর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা কবিতার অন্যতম এ প্রাণপুরুষ। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তার নশ্বর দেহ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও আজীবন কবিতায় সমর্পিত এ কবি বেঁচে আছেন বাঙালির সত্তায়। তার সৃষ্টি আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। বাংলা কবিতায় তিনি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। উভয় বাংলায় সমকালীন সময়ে অন্যতম কবির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সাধারণ মানুষের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে শব্দের ক্ষেত চষে জীবনকে বুকপকেটে নিয়ে হর-হামেশাই ঘুরে বেড়ান একজন কবি। তিনি এমন এক নিপুণ শব্দ শিকারি, যিনি মাথার ভেতর গিজগিজ করতে থাকা শত-সহস্র শব্দ ভাণ্ডার থেকে সর্বাপেক্ষা যথার্থ শব্দগুলোই ব্যবহার করে নির্মাণ করেন কবিতার দেহ, প্রকাশ করেন মনের ভাব ও বিষয়। কবির অনুভূতি যখন কবিতায় প্রকাশ পায়, তখন তা বাঁশির সুরের মতো সবার হৃদয়ে বেজে চলে। এ সুর কখনো নম্র-কোমল, কখনো রুদ্র-রুক্ষ; কখনো এতে গনগনে সূর্যের আগুন থাকে আবার থাকে ধবল জ্যোৎস্নার মতো অপার্থিব মমতার বিচ্ছুরণ। কেননা সর্বমানবের অনুভূতি, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, প্রেম ও বিরহ, জল ও আগুন ধারণ করে সরব থাকে কবির কণ্ঠ; কবি মাত্রই স্পর্শকাতর অনুভূতিপ্রবণ একজন ব্যক্তি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন, মনের প্রবল আবেগ বা অনুভূতি স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে ছাপিয়ে উঠলে তা হয় কবিতা। বোধকরি কবি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হৃদয়ের ধারক ও বাহক বলে আর পাঁচ-দশজন মানুষের চেয়ে জাগতিক দুঃখ ও বেদনাবোধ বহুগুণ ভারী হয়ে কবির অন্তরে বাজে। এ কথা বলা হয়ে যাকে যে, যার হৃদয়ের সংবেদনশীলতা বেশি দুঃখ-কষ্টে তিনি ব্যথিত হন ততো বেশি। কবি হিসেবে, বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী হিসেবে শামসুর রাহমানের বাইরে ছিলেন না। তাঁর বেদনাহত হৃদয়ের দাহছাপ যেমন আছে তাঁর কবিতায় তেমনি আছে কাব্যের নামকরণে ও আত্মজীবনীর নিঃসঙ্কোচ বয়ানে। কেউ জীবনকে এড়াতে পারে না, আর কবিতা জীবনের বাইরের কোনো বিষয়ও নয়। অনেক সমালোচক বলে থাকেন, বেদনাদগ্ধ হৃদয় থেকেই কবিতার উৎপত্তি। সাহিত্যের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেও এ কথার সত্যতা পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, যিনি একজন কবি তিনি একজন মানুষও। তাঁর ব্যক্তি জীবনের সামগ্রিক দুঃখ, বেদনা ও বিষণ্নতাবোধ কোনো না কোনোভাবে কবিতার অক্ষরে উঠে আসবে এমনটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

কবি শামসুর রাহমান একাধারে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক, কলামিস্ট , অনুবাদক ও গীতিকার। পঞ্চাশ দশক থেকে শুরু করে একাধারে কবি প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী বিরতিহীনভাবে সাহিত্য-সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে কাজ করেন। তাকে বাংলা সাহিত্যে ‘স্বাধীনতার কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কবিতায় তিনি স্বাধীনতার মানসে ব্যাপক কাজ করেন। মৌলবাদ, ধর্মান্ধতারিরোধী বিষয়েও প্রভূত স্বাক্ষর রাখেন। রয়েছে প্রেম, দ্রোহ ও বিশ্বজনীনতা। যা আজও সকল বয়সের মানুষকে উজ্জীবিত করে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা কবির অসংখ্য কবিতা ব্যাপকভাবে যোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষকে উৎসাহিত করেছে। তিনি বাঙালীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।

ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে আঠার বছর বয়সে তিনি লেখা শুরু করেন। তার প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় ‘সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ’ পত্রিকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করার পর কবি ১৯৫৭ সালে ডেইলি মর্নিং সান পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কর্ম ও পেশাগত জীবন শুরু করেন। পরে পাকিস্তান রেডিওতে দেড় বছর চাকুরী করেন। দেশ স্বাধীনের পর দৈনিক বাংলা পত্রিকায় যোগ দেন। এক পর্যায়ে এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদকসহ সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে মূলধারা, অধূনা নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

‘তুমি বলেছিলে’ শিরোনামের কবিতাটিতে তিনি লেখেন- বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘর-বাড়ি।/পুড়ছে টিয়ের খাঁচা, রবীন্দ্র রচনাবলি, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার,/ মানচিত্র, পুরনো দলিল। /মৌচাকে আগুন দিলে যেমন সশব্দে/সাধের আশ্রয় ত্যাগী হয়/মৌমাছির ঝাঁক,/তেমনি সবাই/পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগ্বিদিক। নবজাতককে/বুকে নিয়ে উদ্ভ্রান্ত জননী/বনপোড়া হরিণীর মত যাচ্ছে ছুটে।

কবির ‘স্বাধীনতা তুমি’ শিরোনামের কবিতাটি পড়েনি বাংলা ভাষার এমন পাঠক বিরল। স্বাধীনতা তুমি/রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো/মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-/স্বাধীনতা তুমি/শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা/স্বাধীনতা তুমি/পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতই বুকের ভেতর স্পন্দ তোলে ‘স্বাধীনতা তুমি’।

কর্মজীবনে শামসুর রাহমানের কাক্সিক্ষত শান্তি ছিল না। বারবার তাকে কর্মস্থল পরিবর্তন করতে হয়েছে। চাকরি জীবনের অনিশ্চয়তা, উদ্বিগ্নতা আর দশজনের মতো তাঁকে পেয়ে বসেছিল। বেশ কয়েক জায়গায় তিনি চাকরি করলেও পছন্দের চাকরি তাঁর একটাও ছিল না। এ জন্যই হয়তো তাঁকে আমরা দেখি নিজেকে নিয়ে নিজেই রসিকতায় মেতে উঠেছেন। চাকরির বেতনের টাকা নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘তিনশ টাকায় আমি’ সনেটটি। পারিবারিক জীবনে রাহমান খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তার ছোট ছেলে মতিনের মৃত্যুতে। অতি অল্প বয়সে মতিন পুকুরে ডুবে মারা যায়। রাহমানের জন্য এমন শোক সামলে ওঠা কষ্টকর ছিল। শিশুপুত্রকে নিয়ে তাঁর যে শোক তা উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কবিতায়। ‘একটি ফটোগ্রাফ’ কবিতায় রাহমান বলেছেন,

‘বললাম-জিজ্ঞাসু অতিথিকে
এই যে আমার ছোট ছেলে, যে নেই তখন
পাথরের টুকরোর মতন
ডুবে গেছে আমাদের গ্রামের পুকুরে
বছর তিনেক আগে কাক ডাকা
গ্রীষ্মের দুপুরে।
…………….
অতিথি বিদায় নিলে
আবার দাঁড়াই
এসে ফটোগ্রাফটির প্রশ্নাকুল চোখে,
ক্ষীয়মান শোকে।
ফ্রেমের ভেতর থেকে আমার সন্তান
চেয়ে থাকে নিষ্পলক, তার চোখে
নেই রাগ কিংবা অভিমান।’

হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছিলেন, শামসুর রাহমান ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’। তিনি হয়তো জীবনানন্দের ‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক’ নন। রাহমান কষ্টকে রূপ দিয়েছেন কবিতায়। অনেক কবিতা পড়লে হঠাৎ মনে হয় এ তো কবিতা নয়, দুঃখের ভিন্ন কোনো নাম; বেদনাদাহ হৃদয়ের নামতাবলি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে সকল কবিই সুখ-দুঃখের রূপকার। এর মধ্যে কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথ অথবা কেউ নিখাদ যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তবে শামসুর রাহমানকে এদের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ফেলা যায়। তবে এ কথাও স্বীকার্য, সুখবোধের পাশাপাশি শামসুর রাহমানের কবিতায় দুঃখবোধ অনেক বেশি জীবনঘনিষ্ঠ ও মানবিক। আর এমন গুণই তাঁকে যথার্থ শিল্পী হিসেবে খ্যাতির দরবারে পৌঁছে দিয়েছে।

শামসুর রাহমান ছিলেন জনতার কবি। বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। দেশের ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কোন অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, কোন অনাচার হতে দেখলে নিজেকে একাত্ম করে নিতেন এবং তার জবাব দিতেন কবিতার ভাষায়। আশা, বেদনা, ভালোবাসা, দ্রোহ কোনো কিছুই বাদ যায়নি তার কবিতা থেকে। ১৯৫৫ সালের ৮ই জুলাই শামসুর রাহমান জোহরা বেগমকে বিয়ে করেন। কবি’র তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। তাদের নাম সুমায়রা আমিন, ফাইয়াজ রাহমান, ফাওজিয়া সাবেরিন, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন ও শেবা রাহমান।

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশ পায় ১৯৬০ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ রুদ্র করোটিতে (১৯৬৩ ) এবং পরবর্তীতে বিধ্বস্থ নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরত (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে ( ১৯৭০), বন্দি শিবির থেকে (১৯৭২)সহ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রস্ত ৪৮টি, কাব্য সমগ্র ১০, উপন্যাস ৪, গল্প সমগ্র ২, কলাম ২, অনুবাদ কবিতা ৫, অনুবাদ নাটক ২টি, জীবনী ১, শিশুতোষ ১০সহ মোট ৯৮টি পুস্তক প্রকাশ পায়।

সম্মাননা ও পুরস্কারঃ-
• আদমজী সাহিত্য পুরস্কার
• বাংলা একাডেমি পুরস্কার
• একুশে পদক
• নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক
• জীবনানন্দ পুরস্কার
• আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার
• মিতসুবিসি পুরস্কার (সাংবাদিতার জন্য)
• স্বাধীনতা পদক
• আনন্দ পুরস্কার
ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে।

রুদ্র আমিন

মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র, জন্ম : ১৪ জানুয়ারি, ১৯৮১। ডাক নাম রুদ্র আমিন (Rudra Amin)। একজন বাংলাদেশ কবি, লেখক ও সাংবাদিক। নক্ষত্র আয়োজিত সৃজনশীল প্রতিযোগিতা-২০১৬ কবিতা বিভাগে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবন মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র ১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার ফুলহারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোঃ আব্দুল হাই ও মাতা আমেনা বেগম। পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন কেটেছে খাগড়াছড়ি এবং বগুড়া সদর উপজেলায়। বগুড়ার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্স সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন মূল পেশা থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি লেখালেখি এবং সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রায় সব ধরনের গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। বর্তমানে তিনি জাতীয় দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন এর ষ্টাফ রিপোর্টার ও অনলাইন নিউজপোর্টাল নববার্তা.কম এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি উইকিপিডিয়াকে ভালোবেসে উইকিপিডিয়ায় অবদানকারী হিসেবে উইকিপিডিয়া অধ্যয়নরত আছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : যোগসূত্রের যন্ত্রণা (২০১৫); আমি ও আমার কবিতা (২০১৬); বিমূর্ত ভালোবাসা (২০১৮)। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : আবিরের লালজামা (২০১৭)।

https://rudraamin.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।