শুদ্ধ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান গরুর মাংসে…

কলাম

‘আমি গরুর মাংস খাই না; ফ্রিজে সংরক্ষণও করি না। এই ঘোষণার ফলে আশা করছি আমাকে আর বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে রাজপথে এনে হত্যা করা হবে না। ইনশাল্লাহ, নতুন কোনো ইস্যু তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকব।’ এই কথাগুলো লিখেছিলেন সুনেত্রা চৌধুরী একজন বন্ধু।

সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গোহত্যাকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এবং মনে হয়, বিজেপি সরকার সারা ভারতেই গোহত্যাকে বেআইনি করবে। হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াদাবদ্ধ বর্তমান ভারতীয় নদো সরকারের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। একটি পশু হলেও হিন্দুসমাজে গরু দেবতাতুল্য মর্যাদাবান। বিস্ময়কর মনে হলেও এতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। অসংখ্য হিন্দু দেবদেবীর মধ্যে যদি সাপ বা ইঁদুর থাকতে পারে তবে এদের তালিকায় গরু থাকা তেমন কিছুই নয়।

যদি কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের জিজ্ঞেস করা হয়, গরুকে তো আপনারা মা বলে শ্রদ্ধা করেন তাই না? অনেকেই এমন প্রশ্নের উত্তর দেয় বা দিবেন। গরু কখনোই আমাদের মা নয়, আর যখন জিজ্ঞাসা করা হয় আপনারা গরু দুধ পান করছেন কিন্তু মাংস কেন খাচ্ছেন না ? তখন সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় বা দিবেন, শুধু মাত্র আপাত দৃষ্টিতে মায়ের সাথে তুলনা করা হয়, কারণ দুধ এমন একটি খাবার যা মা থেকেই আসে সে মানুষ হোক আর প্রাণী হোক, তাই যখনই এমন প্রশ্ন আসে তখন এমন জবাব অনেক হিন্দু দাদা দিদিরা দিয়ে থাকেন।

এমন উত্তরে শুধুই মনে হয় যে বা যারা এমন ধ্যান জ্ঞান নিয়ে আছেন তারা তাদের ধর্ম সম্পর্কে হয়তো কিছুই জানেন না তাই এমন উত্তর দেন। ঐ সকল ব্যক্তিদের আরও কিছু কথা আছে যা শুনলে হাসবো না কাঁদবো সেটাই চিন্তা করতে পারি না। তারা কতভাবেই না নিজেদের বাঁচানোর কথা সাজিয়ে বলেন……কিন্তু কেন ভাবছেন না দুধ তো কুকুর বিড়ালও তার সন্তানদের জন্য পান করতে দেন। তখন কি কুকুর বিড়াল আপনাদের ঐ যুক্তির সাথে একাত্ততা ঘোষনা করবে?

যখন চামড়ার জুতার কথা বলা হয় তখন বলেন…. আমাদের পূর্ব পুরুষেরা বা মুনি ঋষিরা কেউ চামড়ার তৈরি জুতা পরিধান করতেন না। তারা কাঠের তৈরি খড়ম বা কাঠ ও রাবারের তৈরি এক ধরনের জুতা পরতেন। আমরা যারা আধুনিক যুগে থাকি তাদের অনেক সময় চামড়ার জুতা পরিধান করতে হয় কারন অফিস আদালতে খড়ম পড়ে যাওয়া যায় না। সেই ক্ষেত্রে বলতে হয়, চামড়ার তৈরী জুতা পরা আর জবাই করে মাংস খাওয়া দুই ভিন্ন জিনিস।

আসলে কথার বেলায় দেখি কেউ কম নয়। সে যে ধর্মাবলম্বীই হউক না কেন। কি সুন্দর জবাব, এমন কথায় মনে হচ্ছে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরই খড়ম ব্যবহার করতেন অন্যান্য ধর্মের কোন ব্যক্তিরা খড়ম ব্যবহার করেনি। যাই হোক হিন্দু শাস্ত্রের কিছু কথা উল্লেখ করা হলো ঐ সকল বন্ধুদের জন্য যারা জোর করে আইনি বা ধর্মীয় ব্যখ্যা দিয়ে অন্য ধর্মের হৃদয়ে আঘাত করেন।

১। অসংখ্য হিন্দু রয়েছে যারা নিষ্ঠাবান নিরামিষ ভোজি। তারা আমিষ খাদ্যকে তাদের ধর্ম বিরোধী মনে করে। অথচ আসল সত্য হলো, হিন্দু শাস্ত্রই মাংস খাবার অনুমতি দিয়েছে। গ্রন্থসমূহ উল্লেখ করেছে- পরম বিজ্ঞ সাধু-সন্তরা আমিষ খাবার গ্রহণ করতেন।

২। হিন্দুদের আইনের গ্রন্থ মনুশ্রুতি পঞ্চম অধ্যায় শ্লোক ৩০এ আছে-খাদ্য গ্রহণকারী যে খাবার খায়, সেই সব পশুর যা খাওয়া যায়, মন্দ কিছু করে না। এমনকি সে যদি তা করে দিনের পর দিন। ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করেছেন কিছু ভক্ষিত হবে আর কিছু ভক্ষণ করবে।

৩। মনুশ্রুতীর পঞ্চম অধ্যায়ের ৩১ শ্লোকে আবার বলা হয়েছে- যা মাংস ভক্ষণ শুদ্ধ উৎসের জন্য। ঈশ্বরের বিধান হিসেবে বংশ পরম্পরায় তা জানা আছে।

৪। এরপরে মনুশ্রুতীর পঞ্চম অধ্যায়ের ৩৯ এবং ৪০ শ্লোকে বলা হয়েছেঃ ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করেছেন উৎসর্গের পশু উৎসর্গের জন্যই। সুতরাং উৎসর্গের জন্য হত্যা-হত্যা নয়।

৫। মহাভারত অনুশীলন পর্ব ৮৮ অধ্যায় বর্ণনা করছে – ধর্মরাজ যুধিষ্টির ও পিতামহ ভীষ্ম, এদের, এদের মধ্যে কথোপকথন কেউ যদি শ্রাদ্ধ করতে চায় তাহলে সে অনুষ্ঠানে কি ধরনের খাবার খাওয়ালে স্বর্গীয় পিতৃ পুরুষ (এবং মাতাগণ) সন্তুষ্ট হবেন। যুধিষ্টির বলল, হে মহাশক্তির মহাপ্রভু! কি সেই সব বস্তু সামগ্রী যাহা- যদি উৎসর্গ করা হয় তাহলে তারা প্রশান্তি লাভ করবে ? কি সেই বস্তু সামগ্রী যা (উৎসর্গ করলে) স্থায়ী হবে? কি সেই বস্তু যা (উৎসর্গ করলে) চিরস্থায়ী হবে?

ভীষ্ম বলেছেন, তাহলে শোন হে যুধিষ্টীর! কী সেই সব সামগ্রী। যারা গভীর জ্ঞান রাখে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পর্কে যা উপযোগী শ্রাদ্ধের জন্য। আর কি সেই ফল-ফলাদি যা তার সঙ্গে যাবে। সীম বিচীর সাথে চাল, বার্লী এবং মাশা এবং পানি আর বৃক্ষমূল (আদা, আলু বা মূলা জাতীয়) তার সাথে ফলাহার। যদি স্বর্গীয় পিতৃদেবদের শ্রাদ্ধে দেয়া হয়। হে রাজা! তা হলে তারা এক মাসের জন্য সন্তুষ্ট থাকবে।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করলে, বিশেষ করে বলা হয়েছে তাদের সন্তুষ্টি থাকে পুরো এক বছর। ঘি মিশ্রিত পায়েশ, স্বর্গীয় পিতৃপুরুষের কাছে গরুর মাংসের মতোই প্রিয়। ভদ্রিনাসার (বড় ষাড়) মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করলে পিতৃপুরুষ বার বছর সন্তুষ্ট থাকেন।

পিতৃপুরুষের মৃত্যু বার্ষিকি গুলোর যে দিনটিতে সে মারা গেছে সেই রকম একটি দিন যদি শুক্ল পক্ষের হয় আর তখন যদি গন্ডারের মাংস দিয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে আপ্যায়ন করা যায়- স্বর্গীয় পিতৃ পুরুষের সন্তুষ্টি অক্ষম হয়ে যায়। ‘কালাসকা’ কাঞ্চন ফুলের পাপড়ি আর লাল ছাগলের মাংস যদি দিতে পারো তাহলেও তাদের সন্তুষ্টি অক্ষয় হয়ে যাবে।

বেশ ভাল কথা বলেছিলেন মার্কন্ডেয় কাটজু ভারতে ডাল এবং পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় গোবর এবং গো-মূত্র খাওয়ার অভিনব পরামর্শ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কন্ডেয় কাটজু। তিনি এ বিষয়ে টুইটারে সরকারের উদ্দেশ্যে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘প্রণাম। আজ থেকে গো-মূত্র পান করুন এবং গোবর খান। এসব ওষুধপত্র। ডাল এবং পেঁয়াজ খুব ব্যয়বহুল হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন…. এর আগে গরুর গোশত নিয়ে মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাখকে পিটিয়ে হত্যা করার পরে কড়া মন্তব্য করে বলেন, ‘আমি গরুর গোশত খাই এবং তা খেতে থাকব দেখি আমাকে কে বাধা দিতে পারে।’ তিনি গরুকে মা আখ্যা দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘গরু একটি পশু তা মানুষের মা হয় কি করে? এটা ফালতু কথা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতীয় নদো সরকার এবং তাদের আমলারা শুধু মুসলিমকে টার্গেট করেই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন। মার্কন্ডেয় কাটজু যদি গরুর গোসত খেতে পারেন তবে তাদের সমস্যা কি ? তিনিও তাদের ধর্মকে যথারীতি পালন করে আসছেন। আমি বুঝতে পারছি না এই উগ্রপ্রন্থি সরকার কিভাবে দেশ নেতা হলেন। একটি দেশে কত ধর্মের মানুষের বসবাস হতে পারেন সেটার জ্ঞান তার নেই।

গুরুকে নিয়ে যদি তাদের এতো সমস্যা তবে কেন গরু থেকে দূরে থাকছেন না। ভগবানের চামড়া দিয়ে জুতা তৈরী করে পড়তে বুঝে বেশ ভাল লাগে। এটাই হলো নদো সরকারের আমলাদের কার্যকলাপ। ভগবান তাদের পায়ের নিচেই থাকবে। তারাই তো পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন।
’সর্বপরি ভারতীয় আমলাদের জন্য সুকুমার মিত্র ভাইয়ের মনোব্যক্ত শেয়ার করছি।

গরুরা হিন্দু তাই কোনো গরু মারা গেলে তাকে পোড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেছন এক বিজেপি নেতা।ভারতের উত্তর প্রদেশের বারবাঁকি পুরসভার বোর্ড মিটিংয়ে এই মন্তব্য করেছেন পুরসভার চেয়ারপার্সনের স্বামী তথা বিজেপি নেতা রঞ্জিত শ্রীবাস্তব।

রঞ্জিত শ্রীবাস্তব বলেন, পৃথক বৈদ্যুতিক চুল্লি তৈরি করে তারপর সাদা কাপড়ে মুড়ে গরুর শবদেহের শেষকৃত্যের করতে হবে।এ বিষয়ে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে নজর দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিজের এই প্রস্তাব পাস করাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন তিনি এবং বারবাঁকিতে গরুদের জন্য পৃথক শ্মশানঘাট তৈরির ব্যবস্থা করবেন। যদিও এই ব্যাপারে রাজ্য প্রশাসনের কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।

অশোক সিঙ্ঘল বলেছেন, ‘২০২০ সালের মধ্যে ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হবে।’ এত দেরি হবে কেন? আমরা যারা জীবন সায়াহ্নে তারা ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ সঙ্গে ডুমুরের ফুল আর কাঠালের আমসত্ত্ব দেখে যেতে পারব না। কেন আমরা কি অপরাধ করলাম??? কেসটা তাড়াতাড়ি নামিয়ে ফেলা যায় না সিঙ্ঘল জী???

রুদ্র আমিন

মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র, জন্ম : ১৪ জানুয়ারি, ১৯৮১। ডাক নাম রুদ্র আমিন (Rudra Amin)। একজন বাংলাদেশ কবি, লেখক ও সাংবাদিক। নক্ষত্র আয়োজিত সৃজনশীল প্রতিযোগিতা-২০১৬ কবিতা বিভাগে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবন মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র ১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার ফুলহারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোঃ আব্দুল হাই ও মাতা আমেনা বেগম। পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন কেটেছে খাগড়াছড়ি এবং বগুড়া সদর উপজেলায়। বগুড়ার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্স সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন মূল পেশা থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি লেখালেখি এবং সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রায় সব ধরনের গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। বর্তমানে তিনি জাতীয় দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন এর ষ্টাফ রিপোর্টার ও অনলাইন নিউজপোর্টাল নববার্তা.কম এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি উইকিপিডিয়াকে ভালোবেসে উইকিপিডিয়ায় অবদানকারী হিসেবে উইকিপিডিয়া অধ্যয়নরত আছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : যোগসূত্রের যন্ত্রণা (২০১৫); আমি ও আমার কবিতা (২০১৬); বিমূর্ত ভালোবাসা (২০১৮)। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : আবিরের লালজামা (২০১৭)।

https://rudraamin.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।