সমাজের দর্পণ, তবুও আজ কেন তাদের পেছনে ‘ধান্ধা’ শব্দটি যুক্ত হচ্ছে?

কলাম

সাধারণভাবে যিনি সংবাদপত্রের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন ও লিখেন তাকেই সাংবাদিক বলে অভিহিত করা হয়। তবে বর্তমান সময়ের আধুনিক সাংবাদিকতার বিশাল পরিসরে সাংবাদিককে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় বেঁধে দেওয়া কষ্টসাধ্য বিষয়। এখন সংবাদপত্রের ধরনে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি সাংবাদিকদের কাজের পরিধিতেও পরিবর্তন এসেছে। সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। ‘শতভাগ সঠিক সংবাদ প্রচারের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ ঘটনার সঠিক সংবাদ জানতে চায়। সত্য লুকানোর মধ্যে ঘটনার প্রতিকার হয় না। সঠিক ও সৎ সাংবাদিকতা সমাজ বদলে দিতে পারে।

সংবাদদাতা বা সাংবাদিক (ইংরেজি: Journalist) বিভিন্ন স্থান, ক্ষেত্র, বিষয় ইত্যাদিকে ঘিরে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংবাদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহপূর্বক সংবাদ কিংবা প্রতিবেদন রচনা করে সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরণ করে থাকেন এটাই সাংবাদিক বা সংবাদদাতার কর্ম। একজন প্রতিবেদক তৃণমূল পর্যায় থেকে তথ্যের উৎসমূল অনুসন্ধান করেন, প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার পর্ব গ্রহণ করেন, গবেষণায়সংশ্লিষ্ট থাকেন এবং অবশেষে প্রতিবেদন প্রণয়নে অগ্রসর হন। তথ্যের একীকরণ সাংবাদিকের কাজেরই অংশ, যা কখনো কখনোরিপোর্টিং বা প্রতিবেদন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

সততা একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় গুণ। অনেক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলেও সততার অভাবে অর্জিত সম্মান ধুলোয় মিশে যেতে পারে। যেহেতু গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলা হয়, তাই গণমাধ্যমকর্মীদেরও দর্পণের মতো স্বচ্ছ হতে হবে। এটা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশবিশেষ ও বিশেষ ভূষণও বটে। সাংবাদিকতা যতোটা না পেশা তার চেয়ে অনেক বেশি নেশা, ভালোলাগা। এই নেশাটা হচ্ছে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করার নেশা। আমার মনে হয়, একজন চিকিৎসক যেভাবে মানুষের সেবা করতে পারেন তার চেয়ে অনেক বেশি সেবা করতে পারেন একজন সাংবাদিক। কোন সাংবাদিকের এই নেশা কেটে গেলে তিনি তখন যতোটা না সাংবাদিক থাকেন তার চেয়ে বেশি চাকুরিজীবী।

সাংবাদিকতার রং নেই। এটা হলো স্বচ্ছ জীবাণুমুক্ত পানির মতো। একেবারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার রং এটার। কিন্তু সাংবাদিকতা কি এ রংহীনতা ধরে রাখতে পেরেছে কোনোকালে? পারেনি। আর তাই যোগ হয়েছে রঙিন সাংবাদিকতার। সেটা হলুদ দিয়ে শুরু। হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এ দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের দিকে যেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করেছিলেন বিশ্বমিডিয়া আজও তা দুঃস্বপ্নের মতো মনে রেখেছে। পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনাদানই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। কিন্তু সময় বদলেছে। সাংবাদিকতার রং হলুদ থেকে আরও ভয়াবহ রং কালোর দিকে পর্যবসিত হয়েছে। সংবাদে জনস্বার্থ, দেশস্বার্থ, পরিবেশ স্বার্থ বলে কিছু থাকছে না।

একটা গোলাপ ফুলকে হয়তো সবাই পছন্দ করে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই গোলাপ গাছটির সবুজ পাতাগুলোকে আলাদাভাবে পছন্দ করেন। অথচ সেই সবুজ পাতাগুলোর জন্যই গোলাপ ফুলটিকে এতটা সুন্দর দেখায়। কল্পনা করুন, একটি গোলাপ গাছ, যাতে একটিও পাতা নেই, কণ্টকের মধ্যে ন্যাংটো গাছে শুধু কিছু গোলাপ ফুল ফুটে আছে। এটিকে কি আগের মতোই সুন্দর লাগবে? কখনোই না। এ পৃথিবী সুন্দর এই সবুজের কারণেই। এক সময় বৃক্ষ সুশোভিত অঞ্চলগুলো আমাদের চাহিদা পূরণ করে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনত। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজ আর সেই দিন নেই।

সবুজ সাংবাদিকতা যত দ্রুত প্রসার শুরু করা যাবে ততই মঙ্গল আমাদের জন্য, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। আর এ কাজটা করতে হবে মিডিয়াকেই। কারণ সাংবাদিক তথা গণমাধ্যম হচ্ছে পাঠক-দর্শকদের মাইক। মাইকে প্রচার না করলে সেটা সাধারণ্যে পৌঁছবে কেমন করে? একজন সাংবাদিকের তিনটি গুণ থাকা প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে সততা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং স্বচ্ছতা। বস্তুনিষ্ঠতা, যা সত্য তাই সুন্দর । সৎ সাংবাদিকতা এ সত্যেরই আরাধনা করে। সত্যবিরোধী অবস্থান নিলে; পুঁজি, রাজনীতি, নিছক ব্যবসা বা যে কোনো কোটারি স্বার্থের নামেই অবস্থান হোকনা কেন যথার্থই তা সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের বিপরীতে দাঁড়ায়। এতে সমাজ প্রতারিত হয়, বিভাজিত হয়, সংকট দীর্ঘায়িত হয় এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি ব্যাহত হয়।

সমাজ ও রাষ্ট্র পদ্ধতিতে উদার গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা সর্বজন স্বীকৃত। সৎ, স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল এসবের পরিপূরক নয়, পৃষ্টপোষকও । রাষ্ট্রশক্তি বা রাষ্ট্রক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনৈতিক শক্তির সমালোচনা, সামাজিক অপশক্তিগুলোর অবিচার, দুস্কর্ম, দুর্নীতিসহ নানাবিধ অনিয়মতান্ত্রিকতা জনসম্মুখে প্রকাশ বা প্রচার করা সাংবাদিকতার আরাধ্য দায়িত্ব। কিন্তু এসব করতে গিয়ে অনৈতিকতার অভিযোগ বর্তালে তা পেশার মহত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পাশ্চাত্যে ‘পিস জার্নালিজম’ বা শান্তিবাদী সাংবাদিকতার বিষয়টি বেশ আলোচিত। যুদ্ধ, সংঘাত, দ্বন্দে সাংবাদিকতা সত্য ও শান্তির পক্ষে কতোটা ভূমিকা রাখতে পারে ? । পক্ষ-বিপক্ষের নানা মত সত্বেও, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত নিরসনে সাংবাদিকতার প্রার্থীত ভূমিকার পক্ষে মতবাদ ক্রমশই জোরদার হচ্ছে। যুদ্ধবাজ বা সংঘাতবাজ নয়, মানুষ শান্তি ও সৌহার্দ্যবাদী হবে– মানব সভ্যতার এটিই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কাজেই যে সাংবাদিকতা সমাজে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে, যা মানুষকে নানা তথ্যে সমৃদ্ধ করে, শিক্ষিত করে, তার শান্তিবাদী ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করাই সঙ্গত কাজ।

দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম মানুষের অধিকার এবং গর্ব। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, গোত্রে গোত্রে সংঘাত-সংঘর্ষ বা যুদ্ধে নাগরিক দেশ বা গোত্রভূত্র হবেন–এটিই স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে সাংবাদিকতা মানুষকে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন করে, যা বিবেক জাগ্রত করে, সঠিক সত্য উপস্থাপিত করে সে সাংবাদিকতা নিছক ‘দেশ ও জাতিপ্রেমিকতার আবেগ’ সত্য, শান্তি , সৌহার্দ্য ও মানবাধিকারের স্বার্থে সাংবাদিকতার যোগ্য ভূমিকা নিরূপনের যে সুযোগ বিদ্যমান তার উপযুক্ত ব্যবহার প্রয়োজন। সত্য কখনোই অনস্বীকার্য নয় যে, সাংবাদিকতা সত্য ও শান্তির স্বার্থে ভূমিকা রাখার উপযুক্ত বাহন।

বর্তমান সময়ের বেশির ভাগ মানুষের ক্ষোভ হলো সংবাদের মান নিয়ে। এটা ঠিক যে, একজন সাধারন মানুষের সংবাদ পরিবেশন, এবং একজন প্রফেশনাল মানুষের সংবাদ পরিবেশন এক হবে না। সংবাদ সোর্সের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, সেই সাথে তার সত্যতা এবং গ্রহনযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এবং এটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।

‘ধান্ধা’ শব্দটি পড়তে বা শুনতে হয়তো কারো ভাল লাগবে কিন্তু কোন উপায় নেই কিছু সত্য যা বাধ্য হয়েই এমন তীর্যক এ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়। কারন এই ধান্ধা নামেই এখন সাংবাদিকরা বেশি পরিচিত। কিন্তু সবাই কি ধান্ধাবাজীর সাথে জড়িত ? কক্ষনো না, সবাই এমন হলে হয়তো কোন পত্রিকা বা অনলাইনে সত্য, রুচিশীল ও মানসম্মত সংবাদ প্রকাশিত হত না অথবা তাতে এমন সংবাদ স্থান পেত যা পড়ার অযোগ্য। কিন্তু তা তো হচ্ছে না, প্রতিদিন সংবাদপত্র বের হচ্ছে, অনলাইন সংবাদ পোর্টালগুলোতে প্রতি মুহুর্তে সংবাদ আপডেট হচ্ছে এবং সারাদেশের কোটি কোটি মানুষ পড়ছে। তার মানে এই দাড়ায় এখনো সৎ ও আদর্শবান সাংবাদিকরা রয়েছে যাদের কারণে এখন পর্যন্ত সংবাদপত্রগুলো টিকে আছে আর কোটি কোটি মানুষ সংবাদ পড়ে তা বিশ্বাস করছেন।

রাস্তা ঘাটে চলার পথে পর এবং আপনদের মুখে যখন শুনি সাংবাদিকতা পেশার এখন দাম নাই, সব ধান্ধাবাজে ভরে গেছে তখন মনে হয় সংবাদিতাক খুব লজ্জার একটি পেশা। এই নিয়ে অনেক ভাবনা তৈরী হয় নিজের অজান্তেই তবে কি আমরা ভবিষৎ প্রজন্মকে সাংবাদিকতা মানে ধান্ধাবাজ বোঝাতে চাইছি, তাদের জন্য কি রেখে যাচ্ছি ? সাংবাদিকতা পেশাটি খুব নিম্নমানের খারাপ একটি পেশা? মনের উত্তর এটাই দাড়ায় কিছু সাংবাদিকদের জন্য এই মহান পেশাটিকে ধান্ধাবাজদের পেশা এই ধারনা দিয়ে যাচ্ছি। তাহলে কি ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা পেশাটির নাম হচ্ছে সাংবাদিকতা নাকি ধান্ধা?

পরিশেষে বলতে চাই, সততা একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় গুণ। অনেক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলেও সততার অভাবে অর্জিত সম্মান ধুলোয় মিশে যেতে পারে। যেহেতু গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলা হয়, তাই গণমাধ্যমকর্মীদেরও দর্পণের মতো স্বচ্ছ হতে হবে। এটা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশবিশেষ ও বিশেষ ভূষণও বটে।

রুদ্র আমিন

মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র, জন্ম : ১৪ জানুয়ারি, ১৯৮১। ডাক নাম রুদ্র আমিন (Rudra Amin)। একজন বাংলাদেশ কবি, লেখক ও সাংবাদিক। নক্ষত্র আয়োজিত সৃজনশীল প্রতিযোগিতা-২০১৬ কবিতা বিভাগে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবন মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র ১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার ফুলহারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোঃ আব্দুল হাই ও মাতা আমেনা বেগম। পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন কেটেছে খাগড়াছড়ি এবং বগুড়া সদর উপজেলায়। বগুড়ার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্স সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন মূল পেশা থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি লেখালেখি এবং সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রায় সব ধরনের গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। বর্তমানে তিনি জাতীয় দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন এর ষ্টাফ রিপোর্টার ও অনলাইন নিউজপোর্টাল নববার্তা.কম এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি উইকিপিডিয়াকে ভালোবেসে উইকিপিডিয়ায় অবদানকারী হিসেবে উইকিপিডিয়া অধ্যয়নরত আছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : যোগসূত্রের যন্ত্রণা (২০১৫); আমি ও আমার কবিতা (২০১৬); বিমূর্ত ভালোবাসা (২০১৮)। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : আবিরের লালজামা (২০১৭)।

https://rudraamin.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।